ঢাকা, ১৫ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:৩১:৫৮ || ৩০ কার্তিক ১৪২৬
Advertisement
৯২১

নৈঃশব্দের ভাষা হারানো রাতারগুল

মীর সানজিদা ‍‌আলম ও সাব্বির আহমদ

প্রকাশিত: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৩  


সিলেট থেকে ফিরে: দেশের একমাত্র সোয়াম্প ফরেস্ট বা মিঠাপানির বন ‘রাতারগুল’। বিশ্বে ২৮টি স্বীকৃত সোয়াস্প ফরেস্টের মধ্যে নাম রয়েছে বাংলাদেশের ‘রাতারগুল’ জলাবনেরও।

সিলেট জেলার গোয়াইনঘাট উপজেলার গোয়াইন নদী এবং চেংগিড় খালের মাঝে অবস্থিত রাতারগুল অনন্য সৌন্দর্যের আধার। জলাবদ্ধ এ বনভূমির প্রধান বৃক্ষ জারুল-হিজল-কড়চ। যা বছরে চার থেকে ছয় মাস পানিতে ডুবে থাকে। আর বর্ষা মৌসুমে বন ডুবে থাকে ২০ থেকে ৩০ ফুট পানির নিচে। দেশের অনন্য সুন্দর এ জলাবন দেখতে প্রতিদিন ভিড় করে শত শত পর্যটক।

কেউ চাইলে একদিনেই ঘুরে আসতে পারেন সিলেটের সুন্দরবন খ্যাত ‘রাতারগুল’।

রাতে রওয়ানা দিয়ে সকালে সিলেটে পৌঁছে চাইলে কোন হোটেলে উঠে ফ্রেস হয়ে রওয়ানা দিতে পারেন রাতারগুলের উদ্দেশে।

রাতারগুল যেতে আমরা বেছে নিলাম সবচেয়ে সহজ ও কম খরচের পথ।

সিলেটের আম্বরখানা থেকে বিমানবন্দর সড়ক ধরে সিএনজি অটোরিকশায় চড়ে এক ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছে গেলাম রাতারগুল মোটরঘাট। সারি সারি ছোট ও মাঝারি আকারের ডিঙি নৌকা সাজানো আছে ঘাটে। দাম-দর করে উঠে পড়লাম একটাতে। সেখান থেকে নৌকায় মাত্র দশ থেকে পনের মিনিটে প্রবেশ করলাম জলাবন রাতারগুলে।

মুর্তা (এক ধরনের বেত) বনের ভেতর দিয়ে কিছুদূর এগুতেই চোখে পড়ে দুই একটা কড়চ বা হিজল গাছ। এরপর আরো কিছুদূর গেলেই নয়নাভিরাম দৃশ্য। মৃদু-মন্দ বাতাস আর পানির কাঁপনে সে এক অদ্ভুত ছবি।

তবে যে সুন্দরের হাতছানিতে আমরা ছুটে গেলাম রাতারগুল, তা নিয়ে বেশ হতাশই হলাম। সারি সারি গাছের নৃত্য আর কাঁপা কাঁপা জলে গাছের ছায়া আমাদের অভিভূত করেছে ঠিকই, কিন্তু বনের একেবারে গভীরে গিয়েও খুঁজে পেলাম না নৈঃশব্দের ভাষা। দেখা মিললো না একটাও বাঁদর, পাখি বা সাপের। শুনতে পেলাম না বৈঠা আর পানির সংঘর্ষের ছলাৎ ছলাৎ শব্দ, পাখির কিচির মিচির ডাক।

১৯৭৩ সালে প্রাকৃতিক এই বনকে ‘বন্য প্রাণীর অভয়ারণ্য’ ঘোষণা করে বন বিভাগ। এটা একটা রিজার্ভ ফরেস্টও। কিন্তু রিজার্ভ ফরেস্ট বা বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য ঘোষণা করা হলেও তা সংরক্ষণে নেই ন্যূনতম ব্যবস্থাও। বনের সব জায়গায় সব মানুষের অবাধ যাতায়াত, গাছ কাটা, বনের ভেতরে চিৎকার চেঁচামেচি, মাইকের শব্দ শুনে মনেই হয়নি এটা বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য, একটি রিজার্ভ ফরেস্ট।

১৯২৭ সালের ইনডিয়ান ফরেস্ট অ্যাক্ট অনুসারে সরকার বা কর্তৃপক্ষের অনুমতি না নিয়ে রিজার্ভ ফরেস্টে গাছ কাটা বা যে কোনো ধরনের বন্যপ্রাণী ধরা নিষিদ্ধ। অন্যদিকে বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য বলতে এমন এক জায়গাকে বোঝায় যেখানে সব প্রাণী একা অথবা দলগতভাবে অবাধ ও নির্ভয়ে বিচরণ করতে পারবে। যেখানে তার স্বাভাবিক মৃত্যুর নিশ্চয়তা থাকবে। বাইরে থেকে কোনো প্রাণী এনে সংরক্ষণ করা হলেও প্রাণী বেড়ে ওঠার প্রাকৃতিক পরিবেশ থাকবে।

বনবিভাগ চাইলে সেখানে সাধারণের প্রবেশ, যে কোনো ধরনের শিকার নিষিদ্ধ করতে পারে। সেখানে কিছু নির্দিষ্ট এলাকায় পর্যটকদের প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত থাকে। যেখানেউচ্চৈঃস্বরে মাইক বাজানো যায় না বা কোনোরূপ শব্দ করা যায় না। যার কোনোটাই চোখে পড়ে নি রাতারগুলে।           

রাতারগুল জলাবনের আয়তন তিন হাজার তিনশ’ ২৫.৬১ একর।  বর্ষাকালে পানির নিচে গাছের অর্ধেকটা ডুবে থাকলেও শীতে নেয় ভিন্ন রূপ। বনের পানি কমে যায়। সেসময় পানির সর্বোচ্চ উচ্চতা থাকে ১০ ফুট। বনের অধিকাংশ জায়গার পানিই শুকিয়ে যায়। সেসময় জলের প্রাণীগুলোর আশ্রয় হয় এর ডোবাগুলোয়। আর যখন অতিথি পাখি আসে তখন ডোবার ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় পাখিরা আপনাকে নিজে থেকেই পথ করে দেবে।  

এ বনে রয়েছে নানা জাতের সাপ। সাপের মধ্যে আছে অজগর, গুঁইসাপ, গোখরা, জলধুড়াসহ নানা প্রজাতি। একসময় হয়ত বনের ভেতর দাপিয়ে বেড়াতো মেছোবাঘ, কাঠবিড়ালি, বানর, ভোদড়, বনবিড়াল, বেজি, শিয়ালসহ নানা প্রজাতির বণ্যপ্রাণী। কিন্তু আমাদের চোখে সেসবের কিছুই পড়লো না। তবে যত সকালে যাওয়া যায় ততই নাকি এসব প্রাণী দেখার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।  কিংবা সন্ধ্যার পর।

ঘুঘু, চড়ুই, পানকৌড়ি, চিল, সাদা বক, কানা বক, মাছরাঙ্গা, টিয়া, বুলবুলি, চিল, বালি হাঁসসহ নানা প্রজাতির পাখিও রয়েছে এ বনে।

যেভাবে যেতে পারেন রাতারগুল
দেশের যে কোনো প্রান্ত থেকে সড়ক-রেল-নৌ বা বিমান পথে যেতে পারেন রাতারগুল। তবে যেভাবেই যান না কেন আপনাকে যেতে হবে সিলেট শহরের ওপর দিয়েই।

সিলেট শহর থেকে তিন উপায়ে রাতারগুল যাওয়া যায়।

সিলেটের আম্বরখানা থেকে বিমানবন্দর সড়ক ধরে সিএনজি অটোরিকশায় চড়ে এক ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছে যাওয়া যায় রাতারগুলের মোটরঘাট। সেখান থেকে নৌকায় মাত্র দশ থেকে পনের মিনিটে পৌঁছে যাবেন জলবন রাতারগুল। সিলেট শহরের আম্বরখানা থেকে সিএনজি অটোরিকশা রিজার্ভ নিলে ভাড়া নেবে ৩শ’ থেকে ৪শ’ টাকা। সারা বন ঘুরতে নৌকা ভাড়া নেবে ৪শ’ থেকে ৬শ’ টাকা।

দ্বিতীয় পথে সিলেটের আম্বরখানা পয়েন্ট থেকে সিএনজি নিয়ে গোয়াইন ঘাট। সিএনজি ভাড়া পড়বে পাঁচ থেকে ছয়শ’ টাকা। এরপর ট্রলার যোগে রাতারগুল বিট অফিস। ভাড়া পাঁচ থেকে ছয়শ’ টাকা। সেখান খেকে ডিঙি নৌকায় রাতারগুল জলাবন।

আর তৃতীয় বিকল্প হিসেবে সিলেট থেকে জাফলং-তামাবিল রুট ধরে সারিঘাট। সেখান থেকে ট্রলার যোগে রাতারগুল বিট অফিস। ট্রলার ভাড়া পড়বে এক হাজার থেকে পনেরোশ’ টাকা। সেখান থেকে নৌকাযোগে রাতারগুল। ভাড়া ঘণ্টাপ্রতি দুই থেকে তিনশ’ টাকা।

তবে প্রথম পথই তুলনামূলক সস্তা, সময়ও লাগে কম।।

বনে ঢোকার সময় অবশ্যই লক্ষ্য রাখতে হবে, সেখানে গিয়ে কোনোভাবেই উচ্চৈঃস্বরে আওয়াজ করা বা মাইক বাজানো যাতে না হয়। এতে আপনি যে উদ্দেশে যাবেন তা ব্যহত হবে। আর কোনোভাবেই কিছু খেয়ে প্লাস্টিকের বোতল, ক্যান, চিপস বা বিস্কিটের প্যাকেট পানিতে ফেলবেন না। এতে বনের উদ্ভিদের স্বভাবিক বৃদ্ধি ব্যহত হবে। বনের গাছের সংখ্যা কমে যাবে। বিপন্ন হবে বন্যপ্রাণীর জীবন।    

বাংলাদেশ সময়:  ১০১৬ ঘণ্টা, আগস্ট ১৯, ২০১৩