ঢাকা, ০৭ ডিসেম্বর, ২০১৯ ১৭:৩৯:০৪ || ২৩ অগ্রাহায়ণ ১৪২৬
Advertisement
৬৯৫

লাইফলাইন অব ইন্ডিয়া

ইশতিয়াক হুসাইন

প্রকাশিত: ২৭ নভেম্বর ২০১৮  


অনন্যা এক্সপ্রেস (আজমীরগামী ট্রেন, ভারত) থেকে: ‘দ্রুত করেন, এই নিন রুটি, এই চিকেন। তাড়াতাড়ি ১৩০ টাকা (ভারতীয় রুপি) দিন। এখনই ট্রেন ছেড়ে দেবে।’  

যা বলা তাই কাজ। রুটি-চিকেন রেখে দ্রুতই টাকা দিলাম। চোখের পলকে আরেক বগিতে হারিয়ে গেলেন রাজু চ্যাটার্জি। এভাবে প্রতিদিন ট্রেনে ট্রেনে খাবার বিক্রি করে সংসার চালান রাজু। বয়স ৩০/৩২ বছর হবে। বিয়ে করেছেন। সংসারে মা, স্ত্রী ও এক সন্তান রয়েছে তার। একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি রাজুর কাঁধেই সংসারের সমস্ত ভার।  

পশ্চিমবঙ্গের আসানশোলের বাসিন্দা শুধু রাজুই নন, তার মতো আরো শতশত যুবক, তরুণ এভাবে ট্রেনে খাবার বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন। খাবার ছাড়াও কেউবা জুতা কালি করা, কেউ পানীয় চকলেট বিক্রি করা, কেউ তালা-চাবি, চেইন, বই, কেউবা বাচ্চাদের খেলনা বিক্রি করছেন।     

রাজুর মতো প্রত্যেক যুবক মানে একেকটি পরিবার, একেকটি স্বপ্ন। আর এই স্বপ্নের জাল বোনা হয় হয় ট্রেনের ওপর ভর করে। এই ট্রেন রাজুর লাইফলাইন।   

দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় দেশ ভারতে ট্রেনকে বলা হয়, ‘লাইফলাইন অব দ্য নেশন’। রেলওয়ে বিভাগে ১৩ লাখের বেশি মানুষ কাজ করে। ১৩ লাখের সঙ্গে প্রতিটি পরিবারের আরো লাখ লাখ সদস্যের জীবন জড়িয়ে আছে। এর সঙ্গে আরো লাখ লাখ রাজুর জীবনও জড়িয়ে আছে অতপ্রোতভাবে।   

১৮৪৮ সালে ভারতবর্ষে এক কিলোমিটারও ট্রেনপথ ছিল না। লন্ডন থেকেই ভারতে রেলপথ তৈরির বীজ বোনা হয়। ১৮৫৩ সালে মুম্বাই থেকে থানেতে যাওয়ার মধ্য দিয়ে রেলওয়ের যাত্রা শুরু হয়েছিল ভারতবর্ষে। ১৮৫৭ থেকে ১০ বছরের মধ্যে ব্রিটিশ প্রকৌশলী রবার্ট মেইটল্যান্ডের মাধ্যমে অতি দ্রুতই ভারতবর্ষে ৬৪০০ কিলোমিটারের রেলপথ নির্মাণের কাজ সম্পন্ন হয়। তার কারণে মুম্বাই থেকে কলকাতা সরাসরি রেলযোগাযোগ চালু করা সম্ভব হয়েছিল।   

সেই রেলপথের জালে আজ জড়িয়ে আছে পুরো দেশটি। সবদিকেই হাজার হাজার কিলোমিটারের রেলপথ নেটওয়ার্কে বিস্তৃত ভারত। দূরন্ত এক্সপ্রেস, রাজধানী এক্সপ্রেস, অনন্যা এক্সপ্রেস, শতাব্দী এক্সপ্রেস, ইন্টারসিটি সুপার ফাস্ট এক্সপ্রেসসহ নানা এক্সপ্রেস ট্রেন হাজার হাজার যাত্রী নিয়ে ছুটে চলেছে দেশটির নানাপ্রান্তে। আর সবার ভরসাও যেন তাই ট্রেন। 

কলকাতার শিয়ালদহ রেলস্টেশনে নেমে সেটি বুঝতে যেন কষ্ট হয়নি। শতশত মানুষ ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছে। দিল্লী, জয়পুর, আজমীর, আহমেদাবাদ, ব্যাঙ্গালোর, চেন্নাই, হায়দারাবাদসহ দেশের বিভিন্ন শহরে যেতে ভিড় করছে এসব মানুষ। দুর-দুরান্তে যেমন যাচ্ছে মানুষ তেমনি স্থানীয়ভাবে এক প্রদেশের ভেতরে যেতেও রয়েছে লোকাল ট্রেন।   

১৭টি রেলওয়ে জোনে বিভক্ত ভারতের রেলসেবা খাত থেকে বছরে রাজস্ব আয় হয় ২৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বিশ্বের সবচেয়ে বড় রেল নেটওয়ার্কের অধিকারী ভারত রেলের মাধ্যমে যাত্রী ছাড়াও বিশাল পরিমান পণ্য পরিবহন করে থাকে। দিনে দিনে আধুনিক হচ্ছে তাদের রেল সেবা। আধুনিক ইলেকট্রিক ট্রেনের পাশাপাশি অতীত ঐতিহ্যও ধরে রেখেছে তারা। তাইতো পাহাড়ে দার্জিলিংয়ের রেলওয়ে ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে।